তু লাল পাহাড়ির দ্যাসে যা; গানের বৃত্তান্ত : নানা কণ্ঠে, নানা রুপে

তু লাল পাহাড়ির দ্যাসে যা- অনেক পছন্দের অনেক চেনা একটা গান। সবারই এত পছন্দের এই গান, যে এই গানটির আছে অন্তত সাড়ে তিন কোটি ভার্সন। এই নানা রুপের ভিড়ে এই গানটির আসল স্বাদ খুঁজতেই এই লেখা। এটা যতটা না লেখা তার চেয়ে অনেক বেশি আসলে শোনা। আরও সোজাসাপ্টা করে বললে নিজের পছন্দের ভার্সনগুলোর সংকলন এই ব্লগ। পছন্দ গুলো খুব বেশি আটোসাটো নয়, হাওয়া বাতাস খেলে, চাইলে শ্রোতা-পাঠকরা ঘুড়তে ঘুড়তে একটু গা এলিয়ে বসতেও পারবে। খুলি তাহলে সুতলি দিয়ে বাঁধা বেড়ার দরজা। ধাক্কা দিলেও খোলে, সব দেখাও যায়, তবুও অতিথীর সম্মান বলে কথা।

প্রথম রুপ। অনেক সোজাসাপ্টা করে গাওয়া এই রুপ। অনেকটা সরলতা আছে। বিষাদ বা আনন্দ কোনটাই তীব্র হয়না এখানে। অনেকটা যেন মেনে নেয়ার নিরুত্তাপ আছে গায়কীতে।

এবারেরটা একেবারে বাউলের গলায়। বাউল ধরণে ধারণে হলেও অনেক শহুরে সুর ও নাগরিকতার মিশ্রনে তিনি হয়েছে নাগরিক মিশেল। সুক্ষ্ম মিশেল, কিন্তু ফাঁকি তো দিতে পারবেনা। তবে শুনতে ভাল কারণ বাউলের গলার স্বরের মধ্যে বাউলের মাটির স্বাদটা পাওয়া যায়। সংগীত আয়োজন খানিকটা ডোবালেও পুরোটা পারেনি। গানটা কতটুকু বুঝেছে গৌতম, তাতে একটা সন্দেহ তৈরী করে সে তার গায়কী দিয়েই। অবশ্য এমনটা ধরে নেয়া যেতে পারে, যেন মেনে নেয়াই সুখ। মেনে নিয়ে সুখী হবার নাগরিক চেষ্টা এই নাগরিক বাউলের তো আছেই পুরোপুরি।

অর্ণব ও তার বন্ধুরা মিলেছে গেয়েছে এই রুপটি। অর্ণব মেধাবী, অর্ণবের কম্পোজিশন নিয়ে তাই কোন কথা হবে না। অর্ণব বাংলাদেশের সেরা কম্পোজার- এর উপরে কথা নাই। একটু ত্যাড়ামি হয়ে গেলো। কিন্তু অর্ণবের জন্য এটা করাই যায়।

এ এক ঘরোয়া আড্ডার সংস্করণ। দেশে কি দেশের বাইরে, বাঙ্গালিরা এক হলেই মন গেয়ে উঠে ‘লাল পাহাড়ির দ্যাসে যা’- এই রুপটা বেশ মেলিডিয়াস- অবশ্য তাতে আবেদনের কমতি হয়না। ঝামেলাটা হয় যেখানে, গানটার মধ্যে কথার মোডিফিকেশন। ভাষা ও একসেন্ট মিলে সেই পাহাড়ি, সেই দেশি- সেই আপন চেহারাটা কোথায় যেন নিস্প্রভ হয়ে যায়।

 

স্টেজ পারফরেমেন্সেও গানটি গাওয়া প্রায়ই। এরা গানের রিদমের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, গভীরে যাবে কি করে। হাবুডুবু খেতে খেতেই হাঁপিয়ে উঠে চেনা বাতাসে আসবে নয়তো দম ফুরিয়ে ফেলবে। তবে গায়িকা চোখ বেশ টানে। 😛

পঁচা রেকর্ডিং শুনে শুনে একটু বোর হয়ে গেছেন। ভাল কোয়ালিটির অডিও শুনুন। ফোক স্টুডিও থেকে প্রকাশিত অর্বাচিন ব্যান্ডের গান। শুনতে খারাপ লাগবে না- কিন্তু ঐ যে রিদমে আর মেলোডিতে গানের প্রাণ স্রোতে গা ভাসায়- এত চিন্তা ভাবনার কি আছে- দুলতে থাক।

সহজিয়া যেন চেষ্টা করেছে আসলের কাছাকাছি যাবার। কী গানে কী সূত্র সন্ধানে। সেই আবেগটাও পাওয়া যায়, তবে তা শহুরে ভাব এড়াতে পারেনা।

এবার যেন পাওয়া আসলে রুপের দেখা। সেই বিষাদ, বিষাদ হজম করার রিদম, মেনে নেয়ো অথচ সেই হাহাকার সবই যেন পাওয়া যায় এবার। একেবারে মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, সেই বাউলাঙ্গের স্বাদ।

আগের ভার্সনটারই একটু রুপ। এই গানটা এমনই, আয়োজন যত কম থাকে ততই ভালো।

একটা ভাল ভার্সন দিতে পারলামনা ; লিঙ্ক সাপোর্ট করছে না। শিলিগুড়ির বাসে গাওয়া এক তরুন বাউলের গান। আর ক্লোসআপের শোনাতে সাহস , আগ্রহ, ইচ্ছে কোনটাই হলো না। পূর্ণ ও সাধনা গাওয়া ক্লোজআপের সংস্করণটা শুনে নিতে পারেন যদি এই গানের সবচেয়ে বাজে রুপটা শুনতে ইচ্ছা হয়। এই গানের এই ইন্টারপ্রিটেশন খুব হতাশ করে। এই সিজনটা কে বানিয়েছিল কে জানে। আর বেশ জনপ্রিয় ভার্সণ ভূমিরটাও দিলামনা। ভুমির এই গানের সাথে যারা নাচে তারা নাচুক- তারা নাচবেই। ভুমিও তো নাচাতেই চায়।

শেষটা করি কবি অরুণ চক্রবর্তীর রিসাইটেশন দিয়ে- এই গানটারই। তিনিই লিখেছেন এই গানটি। অবশ্য গান হিসাবে লিখেননি , লিখেছিলেন কবিতা হিসাবে। সেটা লেখা হয়েছিল একটি মহুয়া গাছকে নিয়ে। কবি বলেই বোধহয়, প্রকৃতি আর মানুষকে আলাদা করেননি। সেই মহুয়া আর মাটির কাছাকাছি মানুষগুলো এক হয়ে যায় তাই এই কবিতায়, এই গানে।

ভাল থাকুন। ভাল গান শুধু শুনতে নয়, আবিষ্কার করতে থাকুন।

দীপংকর দীপন